অপরাহ্নিক প্রেম

সকাল সকাল অনিমেষ ফোন দিয়েছিল আজকে। বলল ওর সেই ৮০’র দশকের মুভিতে দেখা বাইকটা নাকি চুরি হয়ে গেছে। ২৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ড ধরে যাচ্ছেতাই গালমন্দ করলো চোরকে। আমি শুধু হাসছিলাম আর বলছিলাম- ‘ছাড় নাহ! এমনিতেই তো অনেক পুরনো হয়ে গেছিলো!’ তাতেও আপত্তি! ‘পুরনো বলেই তো! কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে বল??’ অভিযোগের সুরে বলল অনিমেষ। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত চোরের শ্রাদ্ধ-শান্তি করে তবেই ছাড়লে ফোনটা। পারেও বটে!! কিছুক্ষণ এঘর-ওঘর করে টিভিটা ছাড়লাম, দেখি উত্তম-সুচিত্রার গান হচ্ছে- এই পথ যদি না শেষ হয়…..। হঠাৎ ফিরে গেলাম চল্লিশ বছর আগে। স্মৃতিগুলো দুপায়ে হেঁটে গিয়ে যেন দমকা হাওয়ার মাঝে কড়া নাড়লো সুলেখা আর আমার সপ্তপদীর দোরগোড়ায়। তখন আমি পচিশ, সুলেখারও বা কত হবে! এই ১৯ কি ২০। দুটো বছর সমানে মনগঙ্গায় রঙিন পাল তুলে নৌকা চালিয়ে বেড়ালাম আমরা। সে নৌকায় সুলেখা কখনো স্কুলের কড়া দিদিমণি, কখনো সদ্য জেগেওঠা প্রভাত সূযের মত নববধূ, আবার কখনো আমার প্রেমের অপত্য ছন্দে লেখা মূর্তিময়ী নারীকাব্য! তবে যে রূপেই হোক না কেন, সবসময় ওকে সাথে পেয়েছি। আমার একবেলা খাওয়ার সেই হোস্টেল লাইফ থেকে; ছেলেমেয়ে, নাতিপুতি নিয়ে মহাভোজের সময়েও সেই কাব্য আমার ছন্দ ছাড়েনি। আজ হঠাৎ কেন এইসব মনে পড়ছে? যত নষ্টের গোড়া ঐ অনিমেষের বাইক! আমি তখন সদ্য দুহাজার টাকা মাইনের একটা চাকরী পেয়েছি, সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো সুলেখার রাশভারী বাবাকে কিভাবে আমাদের চারহাত এক করে দেওয়ার কথা বলব তাই ভাবছি। এমন সময় একদিন হঠাৎ সুলেখা এসে আমার আলগোছে রেখে দেওয়া ধনুকে কান্নার তীর বাঁধালে, কোনো এক লাটসাহেবের সাথে নাকি তার গাঁটছড়া বাঁধার দিনক্ষণ ঠিক হচ্ছে! সেদিনই সুলেখার হাত ধরে ওর বাবাকে বললাম আপনার মেয়েকে চাই। আমার আয় রোজগারের কথা শুনে তো তিনি অগ্নিশর্মা! ব্যস! সুলেখার বনবাস, থুক্কু শ্বশুরবাড়ি বাস নিশ্চিত হল, তাও আবার সেই লাটসাহেবের বাড়ি। এদিকে মেয়ে তো কেঁদে অস্থির! আমায় প্রত্যেক চিঠিতে শুধু বলতে লাগল, ‘এ সিঁথিতে যদি কোনোদিন সিদুঁর ওঠে তোমার নামে উঠবে, না হলে সাদা সিঁথি নিয়েই আমি স্বর্গে যাবো।’ আমার আর কি! ডজনখানেক পাগলা বন্ধু নিয়ে ঠিক করতে বসে গেলাম কোথায় নিয়ে যাবো পালিয়ে, বিয়ে কোথায় হবে,থাকব কোথায়! সাত দিনের মাথায় সুলেখার এক বান্ধবীর অত্যানুকুল সাহায্যে এবং আমার কয়েকজন পাগলা বন্ধুর সহায়তায় পালিয়ে বিয়ে করলাম আমরা। সাত দিনের জন্য হানিমুনের ব্যবস্থাও হলো অনিমেষের বাবার পুরনো বাগানবাড়িতে, সিলেটে। আর পুরো সময়টা আমাদের স্বর্গরথের দায়িত্ব পালন করলো অনিমেষের সদ্য কেনা বাইকটি। শুরু হল সুলেখা আর আমার যুগল-কাব্য! তাতে জৌলুসের চাকচিক্য নেই, চাহিদার ঝংকার নেই; শুধু নীরব কিছু অনুভূতি আছে, না বলা কিছু কৃতজ্ঞতা আছে। এর মধ্যে একদিন দুদিন করে চল্লিশটা বছর কেটে গেছে, আমার বেতন দুই হাজার থেকে দুই লাখ হয়েছে, পরিবারের সদস্য সংখ্যা দুই থেকে চার, চার থেকে আট , আট থেকে আবার দুই  হয়েছে। ছেলেমেয়েরা সব তাদের নিজস্ব জীবন নিয়ে অন্য শহরে, অন্য ভুবনে। এই নীড়ে একা পড়ে আছি আমরা দুই বুড়োবুড়ি! নাহ! আজকের এই লগনে বুড়োবুড়ি কথাটা ঠিক মানাচ্ছে না, কপোত-কপোতী? বেশি ছোকরা হয়ে যাচ্ছে! হোক! ভালবাসা আবার বুড়ো হল কবে? এইসব আপন মনে ভাবছি আর হাসছি! হঠাৎ দেখি সামনে দরজা খুলে গিন্নী হাজির। মন্দিরে গিয়েছিলেন পুজো দিতে। “একমনে কি ভাবছিলে আর হাসছিলে শুনি?”- পুজোর থালা রাখতে রাখতে গিন্নী বলল। “অনিমেষের বাইকের কথা।” “অনিমেষের বাইক!” “হ্যাঁ, ওটি গতকাল চোরের আস্তানায় গেছে, অনিমেষফোন করেছিল” “ইশ! কি সাধের ছিলো ওটা ঠাকুরপোর…” “শুধু তোমার ঠাকুরপোর একার? আমাদের নয় বুঝি? হানিমুনের কতা ভুলে গেছ?” মুহুর্তেই সকালে সদ্য ওঠা সূর্যের মত লাল হয়ে গেল সুলেখা! মাথার ওপর আঁচলটা টেনে বলল- যাহ! তুমিও পারো! বয়সটা যেন দিন দিন কমছে! আমার মনে হল আমি যেন চল্লিশ বছর আগেকার সেই সুলেখাকে ফিরে পেলাম! এই এত বছরে নদীর ধারে বসে প্রেমালাপ হয়নি, বহুদূর হাঁটতে হাঁটতে আলগোছে অনেকদিন হাতটা ধরা হয়নি, কোনো উপলক্ষে বা উপলক্ষ ছাড়াই ওর জন্য ওর প্রিয় বেলীফুলের মালা কেনা হয়নি। পাশাপাশি থাকতে থাকতে চিঠি লেখার প্রয়োজনটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সাথে ভালোবাসি বলাটাও! আগে প্রত্যেকটা চিঠির শেষে লিখতাম- “ভালোবাসি প্রিয়া!”-এখন শব্দটা উচ্চারণ করতেও সংকোচ বোধ হয়। আচ্ছা ভালোবাসার তো বয়স নেই, তাহলে আমরা তাকে কেন নিজেদের সাথে বুড়িয়ে দিই? কি দরকার? “আজ দুপুরে কি খাবে? পাকসে মাছের ঝোল না বেগুনের তরকারী? তোমার তো খুব পছন্দের মাছ ঝোল!”-আমার ভাবনায় ছেদ ঘটলো সুলেখার কথায়। ‘তোমার যা ইচ্ছে! খিদে মিটলেই হল!’ আমার স্বভাবসুলভ উত্তর। আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে চলে গেল সুলেখা। হঠাৎ মাথায় আসলো, আচ্ছা যদি আবার সেরকম কাব্যিক একটা চিঠি লিখি! বা শুধু দুঠো শব্দ “ভালোবাসি প্রিয়া!”; লিখে ওর কাছে চুপিচুপি দিই! ও কি সেই তরুণী সুলেখার মত সেটাকে বেলী ফুলের মালা রাখার বাক্সে পরম যত্নে তুলে রাখবে? দেব? দিই বরং! হাতের কাছে যে কাগজ ছিলো তাতেই লিখলাম, ভাঁজ করে যখনই দিতে যাবো হঠাৎ মনে হল কি দরকার এসব আদিখ্যেতার? ও তো নিভৃতে আমাকে ভালোবেসে যাচ্ছে ওর পুজোর মাঝে, ঘরের কাজের মাঝে, আমার পছন্দের পদ রান্নার মাঝে। বড্ড তীব্র পবিত্র এ ভালোবাসা! আমি না হয় না তুললাম আমার অপটু ভালোবাসার ঝংকার! অন্তত এটুকু সত্য নিয়ে মরতে পারবো ও আমারই। সেই ২৫ এ ও ছিলো, এই ৬৫ তেও আছে! ছুঁড়ে দিলাম কাগজটা দলা পাকিয়ে জানালা দিয়ে রাস্তার উপরে। তাকিয়ে রইলাম এসব ভাবনায় ডুব দিয়ে জানালার শিক দিয়ে মিথ্যে জীবনের দিকে। একসময় দেখি কাঁধে ব্যাগওয়ালা একটা তরূণ আমার ছুঁড়ে দেওয়া কাগজটা তুললো, দলা খুলে পড়তে লাগলে লেখাগুলো। কি মনে করে সেটাকে আবার ব্যাগেও ভরে নিলে। কে জানে, আবার এখান থেকেই নতুন কোনো সুলেখার কাছে এ বাণী পৌছবে কি না! ভালোবাসা তো চলমান জীবনের স্রোতে…..!!

 

ফারিহা অমি

সরকারি মাইকেল মধুসুদন কলেজ, যশোর।

Share


Author

সপ্তবর্ণা

Comment Now

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *