ধ্বনিতে জীবন

ল্যাব ক্লাস শেষে অরো আপাকে বললাম শেলফের পিছনের দিকটা পরিষ্কার করতে। দুষ্টু ছেলেমেয়েরা ওখানে কাগজ, ভাঙা পেন্সিলের টুকরো, কালি ফুরানো কলম, বাদামের খোসা আর ভেঙে যাওয়া বিকারের টুকরো কাচ দিয়ে একেবারে আবর্জনার স্তুপ বানিয়ে ফেলেছে। আর কত দিন যে কেউ ওটা সাফ করেনি কে জানে। ল্যাব রিপোর্টগুলি মিলিয়ে নিচ্ছিলাম, অরো আপা এসে জানাল যে পরিষ্কার করা শেষ। কিছু ভাল জিনিসপত্রও পাওয়া গেছে। আর একটা পুরনো ডায়েরি। ডায়েরিটা কোন স্টুডেন্টের হবে ভেবে আমি ওটা রেখে বাকি গুলো তাকে নিয়ে যেতে বললাম। রাতে খাতা দেখতে বসে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। থার্মোডায়ানমিক্স এর টপিকগুলো বারবার করে ক্লাসে আলোচনা করলাম যাতে পরীক্ষার সময় ভুল না হয়। অথচ চার-পাঁচটি খাতা দেখলাম কেউই ঠিকমতো অ্যান্সার করতে পারে নি। এমন মেজাজ নিয়ে আর খাতা দেখা যায় না। হঠাৎ চোখে পড়ল একটি কাগজ। ডায়েরির পাতার ভিতরে রাখা আংশিক বাইরে বেরিয়ে আছে। আর ঐ অংশে কিছু লেখা। হাতের লেখাটি খুব পরিচিত মনে হল। এবার ডায়েরিটা হাতে নিলাম। কাগজে কিসের যেন একটা হিসাব লেখা। অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না যে লেখাটি কার। নিচে একটা তারিখ চোখে পড়ল। ০২/১০/১২। আর আজ তারিখ ১১/০২/১৫।  তারমানে এটা কোন স্টুডেন্ট এর ডায়েরি নয়। কিন্তু কার? অবাক হয়ে ডায়েরিটা খুললাম। সারা ডায়েরিতে কোথাও এর মালিকের হদিস পেলাম না।  সবকিছুই প্রায় সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে লেখা। মাঝে মাঝে কিছু স্বাভাবিক লেখা দেখতে পেলাম। সেই পরিচিত হাতের লেখা। লেখাগুলি ছিল এরকম,

১. দেখতে দেখতে তিনটি বছর কেটে গেল। কিন্তু আমার দিনগুলি একই রকম রয়ে গেল। পিছনের গেইট দিয়ে দৌড়ে বাসে ওঠা, ক্লাসে লাস্ট বেঞ্চে বসে ফার্স্ট বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকা আর ল্যাব ক্লাসে কারো পিছনে দাড়িয়ে তার চুলের গন্ধ নেওয়া। এর বেশি আমার দ্বারা সম্ভব নয়।

২. উফ! ওরা এত বেশি সিনসিয়ার কেন? এমনিতেই তো পাশ হয়। ফার্স্টক্লাস পাওয়ার জন্য এত পড়তে হয় নাকি। এতটুকু পড়েই তো ৩/৪ হওয়া যায়। আর ওই মেয়ে থাকতে, হাহ্! বাবার জন্মেও কেউ ফার্স্ট পজিশন নিতে পারবে নাহ্। কি যে আছে ওর মধ্যে। আল্লাহই জানেন।

৩. মেয়েরা এত অহংকারী হয় কেন? আমার উপরে তো আরও দুজন ছেলেও আছে। তারা তো কখনও এমন করে না আমার সাথে। তাহলে ও কেন করল?

৪. আজ রেজাল্ট পাবলিশ হয়েছে। আমিই ফার্স্ট। বন্ধুদের কথা দিয়েছিলাম ফার্স্ট হলে খাওয়াবো। সবাইকে রেস্টুরেন্টে আসতে বলে দিলাম। সবার দেখা পেলাম। কিন্তু সারাটা দিন অন্ধকারেও চোখ যাকে খুঁজেছিল তার দেখা পেলাম না। কেন জানি মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেল।

৫. আজ আমাদের ভাইবা। আমাদের তিনজনের। ফার্স্ট, সেকেন্ড আর থার্ডের। যে কোন একজনকে ভার্সিটিতে রেখে দেওয়া হবে। টিচার হিসাবে। আমরা বাইরে বসে আছি। কেউ কারও সাথে কথা বলছি না। আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি। কেঁদে কেঁদে একেবারে অসুস্থ হয়ে গেছে মেয়েটি। আমি না থাকলে নিশ্চিতভাবে ওই টিচার হত। আহা, বেচারী! আর কিছু লেখা নেই। আমি এবার সাংকেতিক চিহ্ন নিয়ে পড়লাম। কিছু কিছু বুঝতে পারছি। যেমন: ‘ClO’ দিয়ে কোন রাসায়নিক সংকেত বোঝানো হচ্ছে না। ওটা আমাদের দেওয়া একজন স্যারের নাম। তেমনিভাবে হাইপার অক্সাইট, মাইনিং ক্লোরেট প্রভৃতি অন্যান্যদের রাসায়নিক নাম, কোন জায়গা ইত্যাদি বোঝাচ্ছে। অনেকটা বুঝে গেছি ডায়েরিটা কার তবু বারবার আইডেনটিটি খুঁজতে লাগলাম। ডায়েরির শেষ পাতা সাধারণত আঠা দিয়ে মলাটের সাথে লাগানো থাকে। মনে হল ওর মাঝে কিছু একটা আছে। একটি ভাজ করা কাগজ। তাতে কিছু লেখা, লেখাটি হল, সত্যটি হল বন্ধুদের সাথে বাজি রেখে তোমাকে প্রোপোজ করেছিলাম। তাই তোমার কড়া ভাষার কথাগুলি সেদিন ভালো লাগে নি। তাই সিনসিয়ার হয়েছিলাম। কিন্তু ভাবিনি যে সিনসিয়ারিটির দোহায় দিয়ে তুমি আমাকে অপমান করলে সেই সিনসিয়ারিটি তোমাকে এতটাই কাঁদাবে। কেন জানিনা তোমার কান্না আমার সইল না। কিছুতেই তোমার সারাজীবনের লালিত স্বপ্নকে এভাবে লুফে নিতে পারলাম না। তাই ভাইবাতে স্যারকে হতাশ করে দিয়ে চলে এলাম ভার্সিটি থেকে। জীবনে অনেক কাজই তো হেলায় ছেড়ে দিয়েছি। তোমার জন্য না হয় আরেকটি দিলাম। জানিনা লেখাটি তোমার হাতে পড়বে কিনা। কিন্তু এটা জানি যে, আগামী বছরগুলোতেও তুমি এই বিল্ডিংয়ের ভিতরে চলাচল করবে। সে আশায় ডায়েরিটা শেলফের পিছনে রেখে গেলাম। জায়গাটা নোংরা দেখে তুমি বেজায় রাগ করতে। হয়তো তোমার উদ্যোগেই ওটা সাফ হবে আর এই লেখাটিও হয়তো অরো আপা মারফত তোমার হাতে পৌছাবে আর নয়তো, থাক আর ভাবছি না। সরাসরি তোমাকে দিলে তো আমি আবার সিনসিয়ার হয়ে যাব। হা , হা , হা।

 

নওরীন নাহার।  খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

Share


Author

সপ্তবর্ণা

Comment Now

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *