বৈশাখী কিংবা ফাল্গুনীর গল্প’

নিশিনারী

বৈশাখী কিংবা ফাল্গুনীর গল্প’

নওরীন নাহার

ওর নাম ছিল ফাল্গুনী। আমার বয়সীই হবে হয়তো। আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়তাম। আমরা যে নতুন বাসায় উঠেছিলাম তার পাশের বস্তিতে থাকত ওরা। ঝগড়া-ঝঞ্ঝাট ছিল ওদের নিয়মিত কাজ। তাদের মধ্যে ওদের পরিবারটা ছিল একটু আলাদা, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেত। দারুণ গানের গলা ছিল মেয়েটির, গুণগুণ করে প্রায়ই গাইত সে। কোন কোনদিন দেখতাম লিচু গাছের নিচে এসে হাঁসের খাবার দিচ্ছে কিংবা বাবা নয়তো ভাইয়ের থেকে দু’টাকা বেশি নিয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে। আমি ওর গান শুনেই জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। একদিন ওকে অানমনে গলা ছেড়ে গাইতে দেখে বললাম, ‘বাহ্, খুব সুন্দর গাইতে পারো তো তুমি।’
ফাল্গুনী লজ্জার চেয়ে বেশি বরং ভয় পেয়ে চোখমুখ শুকিয়ে ফেলল। তারপর ইশারায় বলল যে, আমি যেন এটা কাউকে না বলি। জানি না কেন বলেছিল। হয়তো ওর বাসার কেউ গানবাজনা পছন্দ করতো না তাই।

নতুন বাসার পাশেই এই মেয়েটা হতেও পারতো আমার নতুন বন্ধু। কিন্তু সে সুযোগটা আর হল না।
ওর সাথে আমার কোনদিন কথা হয়েছিল কি না সেটা মনে পড়ছে না। শুধু মনে পড়ছে শৈশব-কৈশরের মাঝামাঝিতে দাড়ানো একটি মেয়ে, চোখেমুখে দারিদ্র্যের ছাপ, পরনের জামা-পাজামার কোন মিল নেই, ঢিলেঢালা, মলিন হয়তো কারোর বাদ দেওয়া।
আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই, পুরো টাওয়ার পাড়ার অল্প জায়গার সেই ঘনবসতি, একটি লিচু গাছ, যার নিচে বসে থাকতে দেখেছিলাম মেয়েটিকে শেষবারের মতো।
একদিন দেখি ফাল্গুনী কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াচ্ছে, বাড়ির লোকদের থেকে পালাচ্ছে। আমি দৌড়ে বারান্দায় গেলাম কি হচ্ছে জানার জন্য। ঘটনা খুব সহজ, ফাল্গুনীর মাথা ন্যাড়া করে দিবে কিন্তু সে তা করতে দিবে না। ব্যাপারটা খুব সাধারন, ছোট মেয়েটি তার চুলের মায়া কাটাতে পারছে না আর তার বাড়ির লোকেরা ভাবছে ওর তো চুল বড় রাখার বয়সই হয় নি। আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক অন্তত এটুকুই বুঝেছিল। সবাই মিলে ওকে ধরেই ফেলল। একজন সজোরে ওর ঘাড় চেপে ধরে জোর করে বসায়, বাকিরা হাত পা চেপে ধরে। ও বারবার ঘাড় উঁচু করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিল আর ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছিল। এতক্ষণ পর্যন্ত দৃশ্যটি স্বাভাবিক।
দু’দিন পর দেখলাম ওকে লিচুগাছের নিচে বসে আছে, ন্যাড়া মাথা আর গলায় মোটা ওড়না জাতীয় কিছু প্যাঁচানো, মাফলারের মতো। সেদিন ওর ঘাড় চেপে ধরায় ওর ঘাড়ে ব্যাথা হয়েছে, মাথা নাড়াতে পারছে না, কথাও বলতে পারছে না ঠিকমতো। মাঝেমাঝে গান গাইবার চেষ্টা করছে কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না।

তারপরদিন শুনলাম ওকে হসপিটালাইজড করা হয়েছে।
সেদিন কালবৈশাখীর রাতে ভীষণ ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল। অনেক রাতে যখন সবাই ঘুমাচ্ছে, বৃষ্টিটা একটু কমে এসেছে ভেবে আমি চুপিচুপি জানালাটা খুলে দিলাম আর সাথে সাথেই জানালার পাশেই কেউ আর্ত-চিৎকার দিয়ে উঠল। আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলাম কারণ আমি ভেবেছিলাম রাস্তার পাশে জানালার পাল্লায় কেউ আঘাত পেয়েছে। বাড়ির সবাই জেগে উঠল। ভুল ভাঙল দু’মিনিট পরই এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ, মানুষের হৈ চৈ, কান্নার আওয়াজ। একসময় জানতে পারলাম যে ফাল্গুনী আর নেই। কথাটা আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চাইছিলাম যে, কেউ জানালায় বাড়ি খেয়ে মাথায় সামান্য আঘাত পেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে কাঁদছে। বাবাকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম যে আমি যা ভাবছি সেটাই ঠিক কি না। বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।

বাকি রাতটুকু কেটে গেলে আমি মায়ের সাথে ওদের বাড়িতে গেলাম, সবাই খুব কাঁদছিল। ওর বড় ভাই, প্রায় তিন-চারদিন ঐ লিচুগাছটির নিচে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছিল। পুরো ব্যাপারটায় আমি কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি ভয় পেয়েছিলাম। তারপর অনেক দিন জানালা খুলতে পারতাম না, ঝড়ে লিচুগাছটি নেচে নেচে আমাকে ভয় দেখাত। প্রায় দু’বছর ছিলাম আমরা ঐ ফ্লাটে, তারপর বাসাটা ছেড়ে দিয়ে নতুন অরেকটা ফ্লাটে চলে যায়, তবে ঐ ভয়টা আমাকে ছেড়েছিল তারও অনেকদিন পর।

ফাল্গুনীকে ভুলেই গিয়েছিলাম। অাজ প্রায় তের বছর পর সেই লিচু গাছের পাশ দিয়ে যাবার সময় ওকে আবার দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম। গুণগুণিয়ে গাইছে,। নিজেকে সামলে নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘বাহ্ খুব সুন্দর গাইতে পারো তো তুমি।’
ও আগের মতোই ভয়ে চোখমুখ শুকিয়ে ফেলল। তারপর এক দৌড়ে বস্তির ভিতরে ঢুকে মুহুর্তেই মিলিয়ে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইলাম।

সম্বিত ফিরল জাহানারা আন্টির ডাকে, ‘এইহানে কি করো? ‘
আমি কোনরকমে ওনাকে মেয়েটির কথা বলতেই উনি হেসে উঠলেন, তারপর অনেক খুঁজে মেয়েটিকে বাইরে বের করে আনা হল। ফাল্গুনীর ভাইয়ের মেয়ে। কোন এক কালবৈশাখের রাতে মেয়েটির জন্ম হয়েছিল তাই ওর নাম ‘বৈশাখী’, ক্লাস থ্রিতে পড়ে, ভীষণ শান্ত আর খুব ভালো পড়াশোনায়।
‘আর খুব ভালো গাইতেও পারে’, আমি মনে মনে বললাম।

Share


Author

সপ্তবর্ণা

Comment Now

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *